আমাদের স্টিফেন হকিং

আমাদের স্টিফেন হকিং

শিশু-কিশোর স্কুল কলেজ পড়ুয়া ছাত্র-ছাত্রী জিজ্ঞাসা করে: এই মহাবিশ্ব কী দিয়ে তৈরি, কীভাবে তা কাজ করে, কীভাবে আমাদের স্থানকে বিস্তৃত করে তুলতে পারে,ত্যাদি আরও একটু যাদের জানা আছে তারা জিজ্ঞাসা করে: এই মহাবিশ্বের শুরু কোথায়, শেষই বা কোথায়; এই রকম নানা প্রশ্ন তখন আমরা (যারা অভিভাবক বা শিক্ষক) সাধারত বলে থাকি, এগুলো সব বড় হলে জানবে।  তা সত্ত্বেও কিশোর মন যখন মানতে চায় না, বার বার প্রশ্ন করতে থাকে, তখন খানিকটা বাধ্য হয়ে যে বইটার নাম বলতে হয় সেটা হল কালের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস: মহাবিস্ফোরণ থেকে কৃষ্ণ গহ্বর  যার রচয়িতা ছিলেন এ যুগের অগ্রগণ্য পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং  বিজ্ঞান সাহিত্যের এই জনপ্রিয় বইটি বহু ভাষায় অনুদিত হয়েছে শুধু তাই নয়, একই ভাষায় নানা শিরোনামে অনুদিত হয়েছে  এই যেমন বাংলা ভাষায় অনুদিত হয়েছেকালের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস, কেউ আবার অনুবাদ করেছেন ইতিহাসের জায়গায়ইতিবৃত্তনাম দিয়ে  যাই হোক, এই বই থেকেই আমরা এর স্রষ্টা স্টিফেন হকিং-এর নাম প্রথম জানতে পারি  শিশুমনের মতো করে এই মহাবিশ্বকে জানবার ও বুঝবার কৌতুহল জাগিয়ে দিয়ে গিয়েছেন তিনি

এই চলতি বছরের ১৪ই মার্চ প্রয়াত হলেন এযুগের এক অনন্য তত্ত্বীয় পদার্থবিদ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও মানবতাবাদী বিজ্ঞানী 76 বছর বয়সী স্টিফেন হকিং।  বিশ্বের পদার্থবিজ্ঞানীদের কাছে এবং যুদ্ধ বিরোধী মানুষের কাছে এই দিনটি ছিল দুঃখের দিন।  কারণ হকিং ছিলেন বিজ্ঞান অনুরাগী ছাত্র-শিক্ষক-বিজ্ঞানীদের মধ্যে এক জীবন্ত প্রেরণা। আজ থেকে ৫৫ বছর আগে তখনকার ডাক্তারেরা হকিং-এর স্নায়ুরোগ সারাতে ব্যর্থ হন এবং প্রায় জবাব দিয়ে বলেছিলেন যে তিনি আর মাত্র দু-বছর বেঁচে থাকবেন।  কিন্তু এই রকম মারাত্মক শারীরিক স্নায়ুরোগ (হাঁটা চলা করতে পারেন না, কথা বলতে পারেন না, কেবলমাত্র মুখমণ্ডলের দুএকটা পেশী ও মস্তিষ্কটা কাজ করতে পারত) নিয়েও তিনি পরবর্তী ৫২/৫৩ বছর বেঁচে ছিলেন।  শুধু বেঁচে ছিলেন না, শারীরিক এই ধরনের বিপুল অক্ষমতা সত্ত্বেও বিজ্ঞানে তিনি অসাধারণ অবদান রেখে গেলেন।  চিন্তাশীল মানুষের জন্য রেখে গেলেন যুদ্ধ-বিরোধী মানবতাবাদের আহ্বান। 

স্টিফেন হকিং-এর জীবন এবং মহাবিশ্ব নিয়ে তাঁর কাজে একটি সম্পূর্ণ গাণিতিক ধারণা পাওয়া ও অনুসন্ধানের জন্য তিনি স্মরণীয় হয়ে থাকবেন।  চূড়ান্ত তত্ত্বে তাঁর গাণিতিক সমীকরণগুলি একটি অনুষঙ্গযা মহাবিশ্বের সকল দিকের জন্য সত্য ধারণ করে, বিশালাকার নীহারিকা থেকে অতিক্ষুদ্র পরমাণুর আচরণ পর্যন্ত।  হকিং পদার্থবিজ্ঞানের দুটি গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্ব, সাধারণ আপেক্ষিকতা এবং কোয়ান্টাম বলবিদ্যার মধ্যে সমন্বয় সাধনের প্রথম প্রয়াসের জন্য বিজ্ঞানের ইতিহাসে চিরস্থায়ী জায়গা করে নিয়েছেন। জন হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের জ্যোতির্বিদ্যা এবং পদার্থবিদ্যার অধ্যাপক নোবেলজয়ী বিজ্ঞানী অ্যাডাম রিয়েজ বলেছিলেন, He dove into the chasm between quantum theory and general relativity and came back with a pearl,” অর্থাৎ, হকিং কোয়ান্টাম তত্ত্ব এবং সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের মধ্যে যে ব্যবধান তা অত্যন্ত সুচারুভাবে মুক্তোর মতো সমন্বিত করেছিলেন।

আগে ধারণা ছিল কৃষ্ণগহ্বরের এত বেশি ঘনত্ব যে সেখান থেকে কোনো কিছুই পালাতে পারত না এর আকর্ষণকে উপেক্ষা করে। কিন্তু হকিং-এর গণনা থেকে দেখা যাচ্ছে, আসলে সময়ের সাথে সাথে ফোটন কণাগুলি বেরিয়ে পড়বে, কণাগুলি মহাকাশে ছড়িয়ে পড়বে এবং অবশেষে বিস্ফোরিত হবে।  সাধারণ আপেক্ষিকতাবাদের তত্ত্ব থেকে কৃষ্ণগহ্বর মহাকাশে এমন একটি বিন্দু যার ঘনত্ব অসীম।  এই অসীম ঘনত্বের জন্য মহাকাশের স্থান-কাল চতুর্মাত্রিক কাঠামো এককতার (singularity) মধ্যে পড়ে, যেখানে পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রগুলি প্রযোজ্য নয়।  কিন্তু, ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত হকিংয়ের তত্ত্ব "ব্ল্যাক হোল বিস্ফোরণ?" প্রকাশ করেছে যে, কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞানের কারণেই কণাগুলি একটি কৃষ্ণগহ্বর থেকে পালিয়ে যেতে পারে।  

বিজ্ঞানের অগ্রগতিতে সাধারণত ঘটনাগুলির মধ্যে একটি সংযোগ খুঁজে পাওয়া যায়, যাতে ধারণা করা হয় যে সাধারণ ধারণাগুলির সঙ্গে বিখ্যাত সব আবিষ্কার বিচ্ছিন্ন নয়। যেভাবে আইজাক নিউটন উপলব্ধি করেছিলেন যে, আপেলের পতন ঘটানোর শক্তিটি এমন একটা কিছু, যা চন্দ্রকে পৃথিবীর এবং বিভিন্ন গ্রহকে সূর্যের চারদিকে তাদের কক্ষপথে চলমান অবস্থায় ধরে রাখে।  তেমনি স্টিফেন হকিং মহাকর্ষ এবং কোয়ান্টাম তত্ত্বের মধ্যে একটি গভীর এবং অপ্রত্যাশিত সংযোগ খুঁজে বের করেছেন: তিনি ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে কৃষ্ণগহ্বর সম্পূর্ণ কালো হবে না, এখান থেকেও তবে একটি বিকিরণ হবে। হকিং বিকিরণের আবিষ্কারটি এখন যেহেতু পরিচিত, তাই প্রমাণ পাওয়া যায় যে এই কৃষ্ণগহ্বরগুলো এতই নিখুঁত নয় যে বাকি মহাবিশ্বের সাথে তার কোনো পারস্পরিক ক্রিয়াকলাপ থাকবে না।

শুধু মাত্র জ্যোতির্বিজ্ঞানে স্টিফেন হকিং-এর অবদান গুরুত্বপূর্ণ, তা নয়। শিক্ষাক্ষেত্রে শিক্ষক হিসেবে তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করতেন যে বিজ্ঞানকে শিক্ষিত অধ্যাপকদের চার দেওয়ালের মধ্যে ডেস্কগুলিতে সীমাবদ্ধ করা উচিত নয়, তা এমন হবে যা মহাজাগতিক সত্যিকারের প্রকৃতি সম্পর্কে জ্ঞান সকলের মধ্যে পৌঁছে দেবে। জ হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশিষ্ট অধ্যাপক চার্লস বেনেট বলেছেন, “তাঁর ভাষ্য, তাঁর বই এবং তাঁর আলোচনা, তাঁর সর্বক্ষণের উদ্দীপনা বিশ্বজুড়ে অনেক মনকে অনুপ্রাণিত করেছে

বৈজ্ঞানিক সাহিত্যের সবচেয়ে প্রিয় এবং আবেগপ্রবণ লেখা লিখলেন হকিং ১৯৮ সালে তাঁ বিখ্যাত জনপ্রিয় বই “সময়ের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস: মহা বিস্ফোরণ থেকে কৃষ্ণগহ্বর”।  বিজ্ঞানের এই লোকপ্রিয় বইটিতে কেবলমাত্র আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতাবাদের শক্তি ও ভর যে অবিচ্ছিন্ন সেইটি ছাড়া আর কোনো সমীকরণ বা অঙ্ক তিনি ব্যবহার করেননি। কী অসাধারণ ক্ষমতা থাকলে, বা কীভাবে বিষয়কে আত্মস্থ করলে তবে এই দুরূহ কাজটি করা সম্ভব তা বোঝা যায়।  তিনি তাঁর কাজের কথা বলতে গিয়ে বলতেন: “মানুষের ভুল ধারণা আছে যে গণিত হল কতকগুলি সমীকরণের সমাহার, আসলে কিন্তু তা নয়, সমীকরণ শুধুমাত্র গণিতের বিরক্তিকর অংশমাত্র

হকিং তাঁর এই বিখ্যাত জনপ্রিয় বিজ্ঞানের বইয়ে যে উপসংহার টেনেছেন তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ: “If we do discover a complete theory, it should in time be understandable in broad principle by everyone, not just a few scientists. Then we shall all, philosophers, scientists, and just ordinary people, be able to take part in the discussion of the question of why it is that we and the universe exist. If we find the answer to that, it would be the ultimate triumph of human reasonfor then we would know the mind of Godঅর্থাৎ, যদি আমরা একটি সম্পূর্ণ তত্ত্ব আবিষ্কার করি, তবে তা কালে দিনে শুধু কিছু বিজ্ঞানীই নয়, সকলেই মোটামুটি খানিকটা বুঝতে পারবেতারপর আমরা সবাই, দার্শনিক, বিজ্ঞানী, এবং সাধারণ মানুষ, আমরা এবং আমাদের এই মহাবিশ্ব বিদ্যমান কেন—সেই প্রশ্ন আলোচনা মধ্যে অংশ নিতে সক্ষম হবযদি আমরা এর উত্তর খুঁজে পাই, এটি মানুষের জন্য চূড়ান্ত জয়লাভ হবে—কেন না, তখন আমরা ঈশ্বরের মন জেনে যাব।  এই বক্তব্যের মধ্য দিয়েই স্টিফেন হকিং-এর চিন্তার অভিমুখ আমরা বুঝতে পারব। তিনি বলতে চাইলেন, এত দিন মানুষ যে প্রশ্নের উত্তর দেবার জন্য ভগবানের প্রসঙ্গ টেনে আনত (“তাঁর ইচ্ছাতেই সব”, ইত্যাদি), এখন থেকে তা বিজ্ঞানের ভাষাতেই বোধ হয় বলা যাবে।

এটা হতে পারে যে স্টিফেন হকিংয়ের বিজ্ঞানের সার্বজনীন দৃষ্টিভঙ্গিটি এ্যামাইওট্রফিক ল্যাটারাল স্ক্লেরোসিস  Amyotrophic lateral sclerosis (ALS) এর সাথে তার যুদ্ধের দ্বারা জোরদার হয়েছিল। ১৯৬৩ সালে হকিং-এর মোটর নিউরোন রোগ ধরা পড়েছিল, যদিও কেমব্রিজের সেদিনকার সেই স্নাতক ছাত্র এবং যুবক পদার্থবিজ্ঞানীকে বলা হয়েছিল যে তিনি বড় জোর আর দু-তিন বছর বেঁচে থাকবেন।  আর সেই তিনি প্রথমে জ্যোতির্বিজ্ঞান, এবং পরে মহাবিশ্ব নিয়ে কাজ চালিয়ে যাওয়ার অদম্য চেষ্টা চালিয়ে গিয়েছেন; যদিও হকিং তাঁর শারীরিক দক্ষতা হারান এবং তারপর চলে যায় তার কথা বলার ক্ষমতা।  প্রায় সব দিক থেকে পঙ্গু এই মানুষটি সমস্ত রকমের শারীরিক সীমাবদ্ধতা দূর করে কাজের মধ্যে ডুবে থাকতে পারতেন। আধুনিক পদার্থবিজ্ঞানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারগুলির উন্নতির জন্য এবং সর্বত্র সকলের কাছে অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করে গিয়েছেন তিনি।  আর কাজের মধ্যে থাকতেন বলেই প্রকৃতির গোপন রহস্য বুঝতে ও সাথে সাথে তার উন্মোচনের অনুপ্রেরণা পেতেন।  শারীরিক বৈকল্য তাকে অবসাদগ্রস্ত করতে পারেনি। তাঁর শরীর ও মানসিকতার সঙ্গে যেন সাযুজ্য নির্মাণ করে বসেছে কৃষ্ণগহ্বর থেকে উজ্জ্বল বিকিরণ।

তো গেল বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং-এর চরিত্রের একটা দিক।  আরেকটা দিক হল, তিনি মানুষ হিসেবেও খুব উচ্চমানের ছিলেন।  এক প্রশ্নের উত্তরে তাঁর মেয়ে লুসি বলেছে, তার বাবা শুধু বিজ্ঞানী ছিলেন না, তিনি ছিলেন একজন সৃজনশীল লেখক। প্রায়ই খাবারের সময়ে লুসি তার বাবার ঘরে যেত এবং সেখানে লেখাপত্র নিয়ে আলোচনা চলত ঘরোয়াভাবে। তাঁর চিন্তা করার স্বচ্ছতা, কঠিন জিনিস খুব সহজভাবে প্রকাশ করার ক্ষমতা, এগুলোর মধ্যে তিনি খুব আনন্দ খুঁজে পেতেন।  তিনি তাঁর মেয়ে লুসির পরামর্শেই এবং সাহায্য নিয়ে প্রাথমিকভাবে শিশু-কিশোরদের জন্য পদার্থবিজ্ঞানে দঃসাহসিক গল্পে কাজ করেন।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে, অধ্যাপক হকিং বিজ্ঞান ও ধর্মের মধ্যে সম্পর্কের বিষয়ে মতামত দিতে গিয়ে ২০১০ সালে রচনা করলেন আর একটি বই, গ্র্যান্ড ডিজাইন অবশ্য ঈশ্বরের মন বোঝার কথা তিনি অনেক আগে যখন তাঁর সেই অত্যন্ত জনপ্রিয় বইটি লিখেছিলেন, তাতেই বলে গিয়েছিলেন।  আর এখানে তিনি দেখাতে চাইলেন যে ঈশ্বরকে আর এই মহাবিশ্বের উত্স ব্যাখ্যা করতে প্রয়োজন হবে না।  তিনি বলেছিলেন যে তিনি একজন নাস্তিক ২০১১ সালে দ্য গার্ডিয়ানে প্রকাশিত সাক্ষাত্কারে, হকিং ঘোষণা করেছিলেন:আমরা প্রত্যেকে যা বিশ্বাস করি তা বিশ্বাস করতে পারি এবং আমার মত অনুযায়ী এর সহজ ব্যাখ্যা হল কোনো ঈশ্বর নেই  তিনি দাবি করেছেন যে ধর্মের প্রদেশে ব্যবহৃত প্রশ্নগুলির উত্তর বিজ্ঞান ক্রমান্বয়ে দিচ্ছে। ধর্ম এখনও অবশিষ্ট যে সমস্ত দাবি/প্রশ্ন করতে পারে মহাবিশ্বের উৎপত্তি সম্পর্কে, তারও আর উপায় নেই; এমনকি এখন বিজ্ঞান এমনভাবে উন্নতি করছে, যা শীঘ্রই মহাবিশ্বের শুরু কীভাবে তার একটি সুনির্দিষ্ট উত্তর প্রদান করবে বলে তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন  অন্য এক সাক্ষাতকারে তিনি বলেন, “পদার্থবিজ্ঞানের সূত্রগুলিই এই মহাবিশ্বের সৃস্টি-স্থিতি-লয় সম্পর্কে ব্যাখ্যা করতে পারবে, তার জন্য আলাদা করে আর কোনো স্রষ্টার প্রয়োজন হবে না।

স্টিফেন হকিং অত্যন্ত স্পষ্ট বক্তা ছিলেন এবং তার চিন্তাভাবনা সমস্ত বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে কখনই কোনো রকম কুণ্ঠাবোধ করতেন না।  এই পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নিয়ে তিনি ছিলেন উদ্বিগ্ন।  ধনতন্ত্রের কবলে পড়ে যেভাবে প্রকৃতি নিধন চলচলছে তাতে অচিরেই বিশ্ব উষ্ণায়ণের কারণে পৃথিবীর উপর নেমে আসবে ভয়ঙ্কর এক বিপদ।  ২০০৬ সালে তিনি তাঁর এই আশঙ্কার কথা ব্যক্ত করে বলেছিলেন: “এমন করে সামাজিক, রাজনৈতিক ও পরিবেশগতভাবে ধ্বংস লীলা যদি অব্যাহত গতিতে চলতে থাকে আগামী ১০০ বছরের মধ্যে পৃথিবী ধ্বংসের মুখে পড়বে। 

সাধারণত যাঁরা তথাকথিত বড় মাপের বিজ্ঞানী হয়ে থাকেন তাঁরা গজদন্ত মিনারে বসে কেবল গবেষণার কাজ করতে থাকেন।  গবেষণাগারের চার দেওয়ালের বাইরের জগত সম্পর্কে তাঁদের উদাসীন থাকতে দেখা যায়।  তাঁরা প্রতিষ্ঠান বিরোধী কথা বলতে ভয় পান, বা কিন্তু-কিন্তু করেন।  হকিং ছিলেন এঁদের ঠিক বিপরীত  স্বাস্থ্য পরিসেবা নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন ছিলেন, এবং ইউকে ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস (এনএইচএস)-এর দৃঢ় সমর্থ ছিলেন।  যখন সেই দেশেও আন্তর্জাতিক পুঁজির নগ্ন স্বার্থে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার সুপারিশে শিক্ষা স্বাস্থ্য ইত্যাদি পরিষেবা ক্ষেত্রগুলিকে তড়িঘড়ি ব্যক্তি মালিকের মুনাফার গুহার সামনে ঠেলে দেবার আয়োজন হচ্ছিল, তিনি তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে বলেছিলেন, “আমি সর্বজনীন স্বাস্থ্য পরিষেবাবিশ্বাস করি এবং আমি তা বলতে ভয় পাই না যে (এনএইচএস)-এর বাণিজ্যিকীকরণের বিরোধিতা করা উচিৎ

২০০৩ সালে যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরাক আক্রমণ করে তখন লন্ডনে এক যুদ্ধ বিরোধী শান্তি মিছিলে হুইলচেয়ারে আসীন হয়েই বিজ্ঞানী হকিং অংশগ্রহণ করেছিলেন।  তিনি বলেছিলেন: “গণবিধ্বংসী অস্ত্র মজুত ও ১১ই সেপ্টেম্বরের ঘটনাকে সামনে রেখে আমেরিকা এই দুটি মিথ্যা অজুহাতে ইরাক আক্রমণ করেছে।  দুটো মিথ্যার উপর ভিত্তি করে যদি যুদ্ধ বাধিয়ে দেওয়া যায় ও একতরফা আক্রমণ করা হয় তবে তা যদি যুদ্ধপরাধ না হয়, তবে কোনটি যুদ্ধপরাধ?”

আবার আমরা এই হকিংকে চিনতে পারি মাত্র কয়েক বছর আগে। ২0১৩ সালের জুন মাসের ১৮-২০ তারিখে ইসরায়েল আয়োজিত একটি হাই প্রোফাইল আন্তর্জাতিক সম্মেলন জেরুজালেমে অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল। এই সম্মলনের আহ্বায়ক ছিলেন স্বয়ং ইজরায়েলের তকালীন প্রেসিডেন্ট সিমন পেরেজ।  হকিং, পূর্ব নির্ধারিত একজন বিশিষ্ট বক্তা থাকা সত্ত্বেও এই সম্মেলন বয়কট করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন  তিনি ৩-রা মে তারিখে আয়োজকদের কাছে পাঠানো একটি চিঠিতে বলেন, বর্তমান ইসরায়েলি সরকার যেভাবে ফিলিস্তিনি আগ্রাসন নীতি গ্রহণ করেছে তা বিপর্যয়ের দিকে পরিচালিত হতে পারে  অবশ্য এর জন্য তাঁকে নানা সমালোচনার মুখেও পড়তে হয়।  যাঁরা ইসরায়েল পক্ষের বিজ্ঞানীরা ছিলেন, যাঁরা ইসরায়েল রাষ্ট্রের প্রসাদ পেতে ব-কলমে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের অনুগ্রহ পেতে আগ্রহী ছিলেন তাঁরা মন্তব্য করেছিলেন এমনভাবে যে আসলে হকিং-এর শারীরিক পরিস্থিতিটা ভালো ছিল না।  তাঁরা বলেছিলেন, “হকিং-এর সিদ্ধান্ত তাঁর অসুস্থতার কারণে”।

ভেবে দেখুন, যিনি গত পঞ্চাশ বছর ধরে অসুস্থ থাকা সত্ত্বেও মানুষের জন্য, বিজ্ঞানের জন্য নিরলস কাজ করে গিয়েছেন তাঁর সম্পর্কে এই মন্তব্য ঠিক কিনা।

আবার উল্টোদিকে, ইসরায়েলের মাটিতে সেই বিজ্ঞান সম্মেলন বয়কটের সমর্থনে হকিংয়ের পক্ষে ফিলিস্তিনের ইউনিভার্সিটি একাডেমিক কাউন্সিলের একটি প্রতিনিধিদল এক বিবৃতিতে বলেছিলেন: বয়কটের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করাটা তার স্বাধীন সিদ্ধান্ত।  ফিলিস্তিনি শিক্ষাবিদরা হকিংয়ের সিদ্ধান্তকে ব্যাপকভাবে সমর্থন করেছিলেন ইসরায়েলকে ইভাবে একাডেমিক বয়কটের জন্য ফিলিস্তিনিরা গভীরভাবে স্টিফেন হকিংয়ের সমর্থনকে শ্রদ্ধা করে বয়কট আন্দোলনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ওমর বারঘতি বলেন, “আমরা মনে করি যে এ একাডেমিক বয়কটের মধ্যে আন্তর্জাতিক শিক্ষাবিদদের মধ্যে যে ধরনের স্বার্থকে পুনরুজ্জীবিত করে তা দক্ষিণ আফ্রিকায় বর্ণবাদ বিরোধী সংগ্রামে উপস্থিত ছিলফিলিস্তিনি-আমেরিকান সাংবাদিক আলী আবুনিমাহ লিখেছেন: “যখন আমরা কয়েক বছর পিছনে ফিরে তাকাই, হকিংয়ের সিদ্ধান্তকে একটি টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে দেখা যেতে পারেএই মুহূর্তে যখন ইসরায়েলকে বিচারের কাঠড়ায় দাঁড় করানো গিয়েছে

বিজ্ঞানের বিকাশের ক্ষেত্রে পুঁজিবাদী অর্থনীতি যেভাবে রাশ টেনে ধরেছে তার বিরোধিতা করেছিলেন হকিং।   সমস্ত উন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলিতে বিজ্ঞানের কারিগরি দিকে এবং তার সাথে সাথে যুদ্ধাস্ত্র তৈরির প্রতি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।  কিন্তু মানুষের চিন্তায়, মননে বিজ্ঞানের অনুপ্রবেশের ক্ষেত্রে বিরাট বাধা হয়ে দাঁড়াচ্ছে অন্ধতা, কুসংস্কার।  আর এইগুলিকে এখন বিজ্ঞান বলে চালিয়ে দেওয়া হচ্ছে।  যত পুঁজিবাদ সংকটে পড়ছে তত তারা এগুলোকেই আঁকড়ে ধরতে চাইছে।  ডোনাল্ড ট্রাম্প নির্বাচনের পরে ২০১৬ সালে, হকিং লিখেছিলেন আমরা মানবতার উন্নয়নে সবচেয়ে বিপজ্জনক মুহুর্তে রয়েছিগ্লোবাল ওয়ার্মিংয়ের অনুকূল ডোনাল্ড ট্রাম্পের নীতিমালা গ্রহটিকে বিপন্ন করে তুলতে পারে এবং বিশ্বব্যাপী উষ্ণতা বৃদ্ধি করতে পারে।”

আসুন, এই মহান মানবতাবাদী বিজ্ঞানী জীবন সংগ্রামের উজ্জ্বল প্রেরণাকে বিশ্বব্যাপী বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান সমূহের ভেতরে ও বাইরে সদাজাগরুক করে রাখি


 

লেখক পরিচিতি

0 Comments
Leave a reply

আমাদের স্টিফেন হকিং

11 November, 2021 | : মাখনলাল নন্দগোস্বামী

আমাদের স্টিফেন হকিং

11 November, 2021 | : মাখনলাল নন্দগোস্বামী